প্যারাবনে পাখি শুমারি

প্যারাবনে পাখি শুমারি


দুমাসের সুন্দরবনের খাল পর্যবেক্ষণ করে মাত্রই ঢাকায় ফিরেছি। অফিসের একটু কাজে গুলশান গিয়েছি মনে হলো এত কাছে যখন এসেছি ইনাম ভাইয়ের সাথে দেখাটা করেই যাই। হাতের কাজটা শেষ করেই চলে গেলাম উনার বাসায়। অনেকক্ষন গল্প করলেন। এই দুমাসের সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলেন।

আগে থেকেই শুনছিলাম এবার প্রথমবারের মত বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব সুন্দরবনে পাখি শুমারি করতে যাবে। এই বছর বার্ড ক্লাবের কোন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারিনি বলে প্রচন্ড মন খারাপ ছিল। আর যেহেতু মাত্রই সুন্দরবন থেকে ফিরেছি তাই কী করে আর একবার যেতে চাই সেটাও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। গল্পে গল্পে ইনাম ভাই জানতে চাইলেন আমি আরেকবার সুন্দরবন যেতে চাই কিনা। প্রশ্নটা শোনার পরে কি পরিমাণ ভাল লাগছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। বিনা বাক্যে রাজী হতে গেলাম। উনি বলেন, যদিও এখনও কোনকিছু নির্দিষ্ট না তবে আপনি কিছুটা মানুসিক প্রস্তুতি রাখেন,সামিউল আপনার সাথে যোগাযোগ করবেন।

এরপর থেকে অপেক্ষার প্রহর গুনা। এর মাঝে ৪ দিনের ভ্রমণে বান্দরবন চলে দিয়েছি তাই আমাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছিল না। হঠাত একদিন আমার এক ভ্রমণসঙ্গীর কাছে সামিউল ভাইয়ার ফোন–

‘হুমায়রা, তোমাকে তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ১৫ ফেব্রুয়ারী সুন্দরবন যাব। ইনাম ভাই তোমার কথা বলল। ১৪ তারিখ ইনাম ভাইয়ের বাসায় চলে আস, সবাই মিলে পরিকল্পনা করতে হবে।

কথাটা শুনে আমার সে কি আনন্দ !

১৪ তারিখ চলল সকল পরিকল্পনা। অবশেষে ১৫ তারিখ রাতে আমরা সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়লাম। দলে ছিলেন- সামিউল ভাইয়া, অনু ভাইয়া, ইসরাত আপু আর আনন্দ দাদা। সবার ভেতরেই একটা অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করছে। যদিও এর আগে আমার অনেকবার সুন্দরবন যাওয়া হয়েছে কিন্তু এভাবে শুধুমাত্র পাখির জন্যে এই প্রথম তাই ভাল লাগাটা একটু না অনেকখানি বেশি কাজ করছিল।

১৬ তারিখ ভোরে আমরা খুলনা গিয়ে পৌঁছলাম। খুলনার ফরেস্ট ঘাটেই আমাদের নৌকা রাখা ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। যেতে যেতে নৌকায়ই সকালের নাস্তা সেরে নিলাম।

নৌকা ছাড়ার কিছুক্ষণের মাঝেই আমাদের সাথে সাক্ষাত হলো শুশুকের। একটু পরপরই একটি দুটি করে তারা লাফ দিচ্ছিল। নৌকা ছুটে চলল সুন্দরবনের গহীন থেকে গহীনে। পথে যেতে যেতে দেখা মিললো হরেক রকম পাখির, কখনও সোনাকপালি হরবোলা, কখনও অম্বর চুটকি, কখনও বেগুনি মৌটুসি, কখনওবা সবুজ সুইচোরা সেই আর কতকি।

এভাবে দেখতে দেখতে সন্ধ্যে ঘনিয়ে রাত আমরা ককিলমনি যেয়ে পৌঁছলাম, পরদিন সকাল থেকে আমাদের কাজ শুরু হবে। রাতে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে সবাই শুয়ে পড়ল কারণ কাল খুব সকাল সকাল উঠতে হবে।

১৭ তারিখ। সবাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ল। আজ আমাদের কাজ শুরু হবে ডিমের চর আর পাখির চর দিয়ে। প্রথমে আমরা চরের একটি জায়গাতে নামলাম কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার জন্যে। আমরা যখন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি তখন অনু ভাই হঠাত করেই বলেন সামনে একটা বড় মোটাহাঁটু। যেহেতু এই পাখিটা ইসরাত আপু আর আমার দুজনেই প্রথম দেখা তাই আমরা দুজন একটু বেশি উৎসাহী ছিলাম। একটু খুঁজতে হলো কিন্তু অবশেষে তাকে পাওয়া গেল। কিছু ছবি তোলার পর সামিউল ভাইয়া বলল, এভাবে না ঘুরে আমরা আগে নৌকা নিয়ে পুরো চরটা একবার দেখে আসি তারপর যেখানে পাখির পরিমাণ বেশি দেখা যাবে সেখানে নৌকা থামিয়ে নেমে যাবো।

সেই অনুযায়ী ঢেউ, তার ভাষ্যমতে এভাবে নৌকা থামালে হয় নৌকা উল্টে যেতে পারে অথবা আমরা পানিতে ভিজে যাবো। সামিউল ভাইয়া একটু রেগে গিয়েই বলেন, ভিজলে ভিজবো কিন্তু আপনি নৌকা পাড়ে ভীড়ান। যেই নৌকা পাড়ে ভীড়াতে যাবে ঠিক তখনই বিশাল এক ঢেউ এসে কিছু বুঝে উঠার আগেই আমরা ভিজে চুবচুবো হয়ে গেলাম। খুব বেশি ভয়ও পেয়েছিলাম। সেইদিন অর্ধদিবস আমরা কাটলাম ডিমের চর আর পাখির চরে পাখি দেখে। দেখা মিলল পাতি সবুজপা,পাতি লালপা আর কয়েক প্রজাতির জিরিয়ার সাথে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য- মেটে জিরিয়া, প্রশান্ত-সোনাজিরিয়া, কেন্টিশ-জিরিয়া, ছোট-ধুলজিরিয়া,বড়-ধুলজিরিয়া। দুটো লালচে বক দেখে গোলায়েথ বক ভেবে অনেকটা সময় ছুটে বেড়ালাম কিন্তু অবশেষে যখন নিশ্চিত হলাম সেগুলো লালচে-বক ছিল তখন সবারই খুব মন খারাপ হলো।

দুপুরের দিকে আমরা কটকার উদ্দ্যেশে রওনা হলাম। বিকেলের মধ্যে কটকায় পৌছয়ে গেলাম। পুরো বিকেলটা আমরা পাখি দেখে কাটালাম জামতলা খাল আর জামতলা ওয়াচ টাওয়ারের আশেপাশে। অবশেষে পরবর্তী দিনের পরিকল্পণা করে যে যার মত ঘুমাতে যাওয়া।

পরদিন খুব ভোরে আমাদের বঙ্গবন্ধুর চরে যাওয়ার কথা। সবার কাছে থেকে শোনা এই চরটি নতুন জেগেছে তাই আমরা আশা করছিলাম এখানে ভালই পাখি পাওয়া যাবে এবং আসলেই চরটি আমাদের হতাশ করেনি।

প্রথমেই যখন নৌকা থেকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম তখন দেখা মিলল ঝাঁকে ঝাঁকে বদর কইতর, পেরেগ্রিন-শাহিন, আর পরিযায়ী হাঁসের এক বিশাল ঝাঁক। সাথে আরও দেখা মিলল ছোট-মদনটাকেরও। চরের মধ্যে কাঁদাযুক্ত একটি জায়গা ছিল,জায়গাটি দেখেই সবার প্রথম মনে হলো এটা চামুচ-ঠুটো বাটানের জন্যে একদম উপযুক্ত জায়গা। যেই মনে হওয়া সেই কাজ– টেলিস্কোপ দিয়ে খুঁজতে শুরু করে দিল সবাই।

হঠাত করেই সামিউল ভাইয়া বলল, সামনে পাখিগুলোর মাঝে একটা চামুচ-ঠুটো বাটান। এই একটি পাখি যে আমি কতবার দেখতে চেয়েছি তা বলে বুঝানো যাবে না। টেলিস্কোপে চোখ রেখেই আনন্দে ডগমগ হয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ শুধু তার সেই অসাধারণ রূপ দেখেই গেলাম। হঠাত করেই সে উড়ে চলে গেল আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

চরের একমাথা ঘুরে যখন অন্য মাথায় যাচ্ছি হঠাত করেই অনু ভাই বলে বসলো ‘ অয়েস্টার ক্যাচার’। যদিও অনেকদিন থেকে আমরা এটা নিয়ে মজা করছিলাম তাই প্রথমে ভাবলাম হয়ত দুষ্টমি করছে কিন্তু যখন চোখের সামনে আসলেই এই পাখি দেখলাম তখনকার অনুভূতি প্রকাশ করার মত ভাষা আসলেই নেই। যখন থেকে এই পাখিটির ছবি দেখাছিলাম ঠিক তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম কোন একদিন আমিও এই পাখিটি দেখবো আর আজ আসলেই পাখিটি চোখের সামনে তাও একটি না দু দুটো পাখি। সামিউল ভাইয়ার জন্যেও পাখিটি নতুন ছিল তাই ভাইয়া অনেকবেশি উত্তেজিত ছিলেন। অনেকদিন পর ভাইয়াকে তার আগের রূপে দেখে আসলেই ভাল লাগছিল।

কিছুক্ষণ ছবি তোলার পর দুপুরের খাবারের জন্যে নৌকায় ফিরে গেলাম। যেহেতু এই চরটা আসলেই পাখির জন্যে অনেকবেশি দারুণ তাই এখানে বিকেলটা কাটিয়ে দিবো বলে সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম।

দুপুরের খেয়ে একদমই দেরি করলাম না। চলে আসলাম আবার। এবার মূল লক্ষ্য ছিল ওখানে ঘাসের যে জায়গাটা আছে সেটা পর্যবেক্ষণ করে দেখা। সেখানে দেখা মিলল- পাতি-তুতি, লালগলা-তুলিকা আর কয়েক প্রজাতির ফুটকির সাথে। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিলাম লালগলা-তুলিকা দেখে। বিকেল বেলায়ও আবার অয়েস্টার ক্যাচারদের সাথে সাক্ষাত হয়ে গেল।

এরপর সন্ধ্যার মধ্যে চলে আসলাম আলোর কোলে যেখানে আজ আমাদের রাতের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আলোর কোলের সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হলো এখানে খুব শুটকির গন্ধ যেটা সহ্য করাটা আমাদের সবার জন্যেই কষ্টকর ছিল। রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার পরদিনের পরিকল্পণা নিয়ে বসা। ঠিক হলো পরদিন আমরা পুতনি চর আর মান্দারবাড়িয়া যাবো।

সকালে নাস্তা শেষ করেই পুতনির উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম। সেখানে দেখা পেলাম- নানা প্রজাতির জিরিয়া, নাটা-গুলিন্দা, ইউরেশিয়-গুলিন্দা আরও হরেক রকমের সৈকতের পাখির সাথে। সকালের পুরো সময়টা সেখানে থেকে আবার চলে আসলাম নৌকাতে। কোনমতে নাস্তা করেই মান্দারবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লাম কিন্তু সমুদ্র এতবেশি উত্তাল ছিল যে আমরা কোনক্রমেই মান্দারবাড়িয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলাম না। সবাই কমবেশি ভয় পেলাম। অবশেষে ঠিক করলাম যেহেতু সমুদ্র এখন খুবই উত্তাল তাই আমাদের বেশি রিস্ক না নেয়াই ভাল। তাই সেখানেই যাত্রা শেষ করে দিয়ে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিন্তু যেহেতু ইসরাত আপু কখনও প্যারাপাখি দেখেননি তাই একটু মন খারাপ করছিল। আমাদের বোটম্যান বলছিল। মন খারাপ করার কিছু নেই রাস্তায় দেখা পেয়ে যেতেও পারি।

এরপর শুরু হলো চুলচেরা খোঁজাখুঁজি। অবশেষে তার দেখা পেয়েও গেলাম কিন্তু সেটা শুধুমাত্র একঝলকের জন্যে আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল যার জন্যে তাকে আমরা খুঁজছিলাম– ইসরাত আপুই দেখেনি। আবার খুঁজতে লাগলাম। এবার একদম পাশেই তাকে পাওয়া গেল। একদম আমাদের নৌকার পাশে। সবাই এবার প্রাণ ভরে দেখে নিল। শেষের দিকে ব্যাপারটা এমন হলো যে ছবি তুলতে তুলতেও সবাই ক্লান্ত হয়ে গেল। এবার শুধু তার সেই অপূর্ব রূপই অবলোকন করলাম।

এরপর বিভিন্ন খাল পার হয়ে পৌঁছালাম হারবারিয়াতে। কিছুক্ষণ সেখানে পাখি দেখে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আমরা হারবারিয়া থাকব না, করমজল চলে যাবো। সকালে সেখানে পাখি দেখে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবো। যা বলা তাই কাজ। রাতে আমরা করমজল পৌঁছালাম। সকালে করমজলে পাখি দেখেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

কেন যেন খুব মন খারাপ হচ্ছিল। আসলে এতগুলি দিন সবাই একসাথে থাকাতে একটা পরিবারের মত হয়ে গিয়েছিলাম। ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছিল। তবে এই সম্পূর্ণ যাত্রায় যেই পাখিটির সবচেয়ে বেশি দেখা মিলেছে সেটা হলো, ‘ছোট-মদনটাক’।

সব মিলিয়ে অনেক অনেক বেশি ভাল ছিল সম্পূর্ণ যাত্রা। অনেকদিন মনে থাকার মত।

+ There are no comments

Add yours